প্রতিবেদন

ই-টোল এবং ই-টিকেটিং সেবার সম্প্রসারণ

ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ তুষার: বিদ্যমান সরকারি সেবা ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও আইসিটি বিভাগের তত্ত্বাবধানে এটুআই প্রোগ্রামের ‘মাইগভ’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিক সেবাসমূহ ডিজিটাল করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে, দেশের সকল দর্শনীয় ও পর্যটনস্থলের টিকেট ব্যবস্থাপনা একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আনার লক্ষ্যে মাইগভ ‘ই-টিকেটিং’ চালু করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে লালবাগ কেল্লা ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে এই সেবা কার্যকর হয়েছে। গত বছর ৩০ জুন লালবাগ দুর্গে ই-টিকেটিং চালুর পর ছয় মাসে ৩ লাখের বেশি দর্শনার্থী এই সেবা নিয়েছেন এবং প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি সরকারি রাজস্ব একপে’র মাধ্যমে আদায় করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ ও বাগেরহাট জাদুঘরেও ই-টিকেটিং চালু করা হয়েছে। ম্যানুয়াল টিকিটিংয়ের পরিবর্তে এই উদ্যোগ দর্শনার্থীদের ভোগান্তি কমাচ্ছে এবং রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে। প্রথম দিনে প্রায় চারশত দর্শনার্থী ই-টিকেটিং ব্যবহার করেছেন।

ই-টিকেটিং প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘‘নিজ মোবাইল ফোনে অনলাইনে টিকেট ক্রয় করে কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে প্রবেশ করে সেবাটি গ্রহণ করা যাবে। এই উদ্যোগ নাগরিকবান্ধব ডিজিটাল সেবাকে আরও এগিয়ে নেবে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে। নতুন বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে এটি একটি বাস্তব ও দৃশ্যমান অগ্রগতি।’’

ই-টিকেটিং চালুর ফলে আর লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হবে না। দর্শনার্থীরা দেশের যে-কোনও স্থান থেকে অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে মাইগভের ওয়েবসাইট (eticketing.mygov.bd)–এ প্রবেশ করে টিকেট সংগ্রহ করে নির্ধারিত দিনে প্রবেশ করতে পারবেন। টিকেট বিক্রয় ও দর্শনার্থীর প্রাথমিক তথ্য ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকায় শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সহায়ক হবে।

বর্তমানে গাজীপুরের সাফারি পার্ক ও সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে ই-টিকেটিং চালুর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পরবর্তী ধাপে সুন্দরবনের করমজল সহ বন অধিদপ্তরের আওতাধীন মোট ১১টি পর্যটন স্পটকে এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ৩১টি স্পটকেই (যেখানে টিকেট প্রয়োজন হয়) এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন জাতীয় চিড়িয়াখানাকে ই-টিকেটিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ই-টিকেটিং সেবার বাইরে বিদ্যমান ইটিসি’র পাশাপাশি নন-স্টপ ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) সিস্টেমও চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গাড়ি থামানো ছাড়াই নির্ধারিত লেন ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল পরিশোধ করে সেতু পার হওয়া যাবে। এটিকে নাম দেয়া হয়েছে ‘ডি-টোল’। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সেতু বিভাগের সঙ্গে আইসিটি বিভাগ যৌথভাবে কাজটি করছে।

ইলেকট্রনিক টোল ব্যবহারের জন্য প্রথমে ব্যবহারকারীদের নিজ নিজ পেমেন্ট ওয়ালেট (ট্যাপ, বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) অ্যাপে গিয়ে ‘D-Toll’ অপশনে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন ও রিচার্জ করতে হবে। এরপর পদ্মা সেতুর আরএফআইডি বুথে শুধু প্রথমবারের মতো আরএফআইডি ট্যাগ চেক ও রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে। প্রক্রিয়া শেষে গাড়ি ব্যবহারকারীরা ন্যূনতম ৩০ কিমি, সর্বোচ্চ ১২০ কিমি গতিতে ইটিসি লেন ব্যবহার করতে পারবেন এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল কাটা হবে।

ডি-টোল সেবা প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘‘মানুষের যাত্রা অভিজ্ঞতা আরও সহজ ও উন্নত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। নগদভিত্তিক টোল আদায় ব্যবস্থায় গাড়ির গতি কমে গিয়ে মূল্যবান সময় অপচয় হয়। ডি-টোল চালুর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে টোল প্রসেসিং সম্ভব হবে, ফলে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকবে এবং মূল্যবান সময় সাশ্রয় হবে। এটি দেশের মহাসড়ক ও সেতুগুলোর জন্য একটি একীভূত টোলিং ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর হয়।’’

পদ্মা সেতুতে পাইলটের পাশাপাশি রোল আউটও সম্পন্ন হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিদিন সাড়ে ৩ লক্ষ টাকার বেশি আদায় হচ্ছে। অতি দ্রুত দেশের যমুনা সেতু এবং মেঘনা-গোমতী সেতু সহ দেশের আরও ১৭টি প্রধান প্রধান সেতুতে ডি-টোল সেবা সম্প্রসারণ করা হবে। নাগরিকদের হয়রানি মুক্ত সেবা দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা শুরু হয়েছে, এতে বাঁচবে নাগরিকদের যাত্রার সময় এবং শ্রমঘণ্টা।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় এটুআই-এর তৈরি করা এই সিস্টেমটির পাইলট কার্যক্রম গত বচছর ১৫ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুতে শুরু হয়। এরপর থেকে ৬,০০০-এর বেশি যানবাহন নিবন্ধিত হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি টাকা লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে এবং ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান (বিকাশ, নগদ, ট্যাপ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক) যুক্ত হয়েছে।

এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকগণ সহজে ও নির্বিঘ্নে ডি-টোল সেবা ব্যবহার করতে পারছেন। ডি-টোল সিস্টেমে নতুন কোন একাউন্ট বা অ্যাপের প্রয়োজন নেই। গ্রাহকের বিদ্যমান যে কোন মোবাইল ব্যাংক (বিকাশ, নগদ, ট্যাপ) কিংবা ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটালি টোল পরিশোধ করা যাচ্ছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *