২০২৬ সালে প্রযুক্তি দুনিয়ায় যেসব বড় পরিবর্তন আসছে
শামীমা আক্তার: বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাত দ্রুত ও গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক দশক আগেও যেসব প্রযুক্তি কেবল গবেষণাগার বা কল্পবিজ্ঞানের গল্পে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকরাডার–এর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সাল প্রযুক্তি দুনিয়ার জন্য হতে যাচ্ছে এক যুগান্তকারী বছর।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালে যেসব প্রযুক্তিগত ভিত্তি ও বিনিয়োগ তৈরি হয়েছে, তার বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে ২০২৬ সালে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কমপিউটার চিপ, স্মার্টফোন, রোবট, অগমেন্টেড ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এর প্রভাব পড়বে সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে বৈশ্বিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত।
সর্বত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)
২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর আলাদা কোনও প্রযুক্তি থাকবে না বরং এটি হয়ে ওঠবে সব ডিজিটাল সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সার্চ ইঞ্জিন, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, অফিস সফটওয়্যার, গ্রাহকসেবা, এমনকি অপারেটিং সিস্টেমেও এআই সরাসরি সংযুক্ত থাকবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ওপেনএআই ২০২৬ সালে জিপিটি-৬ উন্মুক্ত করতে পারে, যা আগের মডেলগুলোর তুলনায় আরও উন্নত যুক্তি বিশ্লেষণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জটিল সমস্যা সমাধানে সক্ষম হবে। তবে মানুষের মতো চিন্তা করতে পারা আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (এজিআই) এখনই আসছে না বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এ পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগবে।
এআই বাজারে বড় দুই প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য
২০২৬ সালে এআই খাতে প্রতিযোগিতা ক্রমেই সীমিত হয়ে আসতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, গুগল ও ওপেনএআই এই দুই প্রতিষ্ঠান এআই দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকবে। গুগলের জেমিনি এআই ধীরে ধীরে সার্চ ইঞ্জিনের সঙ্গে একীভূত হবে। ফলে ব্যবহারকারীরা বুঝতেই পারবেন না তারা সাধারণ সার্চ ফল দেখছেন, নাকি এআই–নির্ভর বিশ্লেষণ। অন্যদিকে, চ্যাটজিপিটি অনেক ব্যবহারকারীর কাছে ইতিমধ্যেই বিকল্প সার্চ টুল হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। এর ফলে ছোট ও মাঝারি এআই স্টার্টআপগুলোর জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে ওঠতে পারে।
এনভিডিয়ার অব্যাহত আধিপত্য, গেমারদের উদ্বেগ
এআই চিপ ও গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) বাজারে এনভিডিয়া ২০২৬ সালেও নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বড় বড় ডেটা সেন্টার, এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও ক্লাউড সেবায় এনভিডিয়ার চিপের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। তবে এর বিপরীতে গেমারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে। কারণ এনভিডিয়া ভোক্তা পর্যায়ের গ্রাফিকস কার্ডের তুলনায় এআই ও করপোরেট খাতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যার ফলে মূল্য ও সরবরাহ নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অ্যাপলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বছর
২০২৬ সাল অ্যাপলের জন্য হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত স্মার্ট গ্লাস বা এআর চশমা অবশেষে বাজারে আনতে পারে প্রযুক্তি জায়ান্টটি। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালের শেষ দিকে অ্যাপলের প্রথম প্রজন্মের স্মার্ট গ্লাস উন্মোচন হতে পারে। এই ডিভাইসটি হবে হালকা, আধুনিক এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী যা স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে সিরিকে আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের এআই আপডেট আনার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মানবাকৃতির রোবট বাস্তবতার পথে
২০২৬ সালে হিউম্যানয়েড বা মানবাকৃতির রোবট আরও বেশি আলোচনায় আসবে। কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে গ্রাহকদের হাতে রোবট সরবরাহ শুরু করতে পারে। যদিও এসব রোবট এখনও ধীরগতির এবং সীমিত কাজ করতে সক্ষম, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে আগামী কয়েক বছরে এগুলোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। গুদাম, কারখানা, স্বাস্থ্যসেবা ও গৃহস্থালি কাজে রোবট ব্যবহারের বাস্তব উদাহরণ দেখা যেতে পারে।
ফোল্ডেবল ফোনের বিস্তার ও নতুন ডিজাইন
ভাঁজ করা স্মার্টফোন বা ফোল্ডেবল ফোন ২০২৬ সালে আরও জনপ্রিয় হতে পারে। স্যামসাংয়ের পাশাপাশি অ্যাপলও প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন বা আইপ্যাড উন্মোচন করতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে এই ডিভাইসগুলো সাধারণ ব্যবহারকারীর নাগালে আসবে কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মূল্যের ওপর। প্রযুক্তি যত পরিণত হবে, মূল্য কমার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
নতুন সংযোজন: ক্লাউড কম্পিউটিং ও ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা
২০২৬ সালে ক্লাউড কম্পিউটিং আরও বিকেন্দ্রীভূত হবে। ব্যবহারকারীরা চাইবেন তাদের ডেটা কোথায়, কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। ফলে ডেটা প্রাইভেসি, এনক্রিপশন ও লোকাল এআই প্রসেসিং বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠবে। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নতুন ডেটা আইন কার্যকর হলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আরও স্বচ্ছ হতে বাধ্য হতে হবে।
র্যাম ও চিপ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা
২০২৫ সালে শুরু হওয়া র্যাম ও সেমিকন্ডাক্টর সংকট ২০২৬ সালে আরও প্রকট হতে পারে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় মূল্য বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে পিসি, ল্যাপটপ ও গ্রাফিকস কার্ডের বাজারে। যেহেতু অধিকাংশ র্যাম ও চিপ উৎপাদিত হয় তাইওয়ান ও চীনে, তাই নতুন কারখানা তৈরির উদ্যোগ নিলেও এর তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া যাবে না। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য প্রযুক্তিপণ্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল প্রযুক্তি দুনিয়ায় কেবল উদ্ভাবনের নয়, বাস্তব প্রয়োগের বছর হতে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন ডিভাইস, রোবট ও বৈশ্বিক সংকট সবকিছু মিলিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন বদলে যেতে পারে আমূল। তবে এই পরিবর্তন মানুষের জীবন কতটা সহজ করবে, নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।





