প্রতিবেদন

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশে শিক্ষার কৌশল: অনলাইন না অফলাইন

সোহেল মৃধা: বর্তমানে আমেরিকা, ইরান এবং ইসরাইলকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে ত্রিমুখী উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ‘হরমুজ’ প্রণালীর মতো কৌশলগত সমুদ্রপথ ঝুঁকির মুখে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি একটি অশনি সংকেত, কারণ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ আমদানিকৃত ফার্নেস অয়েল এবং এলএনজি- এর ওপর নির্ভরশীল।

জ্বালানি সাশ্রয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: অনলাইন বনাম অফলাইন বিতর্ক
এই সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার যখন স্কুল-কলেজের ক্লাস অনলাইনে নেয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা চিন্তা করে, তখন দুটি বিপরীতমুখী প্রভাব সামনে আসে। সামষ্টিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে এই প্রভাবগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ জরুরি।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমীকরণ: সামষ্টিক বনাম ব্যক্তিগত পর্যায়
সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, কিন্তু বাস্তব উপাত্ত ভিন্ন কথা বলে। একটি আদর্শ শ্রেণিকক্ষে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী যখন অবস্থান করে, তখন মাত্র ২-৩টি ফ্যান এবং অল্প সংখ্যক লাইট দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব। কিন্তু একই সংখ্যক শিক্ষার্থী যখন যার যার বাড়িতে অবস্থান করে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হয়, তখন প্রায় ৪০-৫০টি আলাদা ফ্যান, অসংখ্য লাইট এবং ব্যক্তিগত কমপিউটার বা ল্যাপটপ বা ট্যাব বা স্মার্টফোন চার্জিংয়ের প্রয়োজন পড়ে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ না কমে বরং অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক খাতে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ঢাকার একটি মাঝারি মানের স্কুলে যদি ১,০০০ শিক্ষার্থী থাকে এবং তারা ২০টি রুমে বসে ক্লাস করে, তবে সেখানে সর্বোচ্চ ৪০-৬০টি ফ্যান চলে। কিন্তু এই ১,০০০ শিক্ষার্থী যখন বাড়িতে বসে অনলাইন ক্লাস করে, তখন অন্তত ৮০০ থেকে ৯০০টি আলাদা ফ্যান এবং সমসংখ্যক ডিভাইসের চার্জিং পয়েন্ট সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ, সামষ্টিক সাশ্রয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অপচয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

পরিবহন খাতের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান
অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবহন জ্বালানি (অকটেন, ডিজেল, সিএনজি) সাশ্রয়ে। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক যানবাহনের সংখ্যা বিপুল।

সরাসরি জ্বালানি সাশ্রয়: হাজার হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি এবং স্কুল বাস চলাচল বন্ধ থাকলে দৈনিক বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত তেল সাশ্রয় হয়।
জেনারেটর ও ক্যাপটিভ পাওয়ার: অনেক বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লোডশেডিংয়ের সময় উচ্চ ক্ষমতার ডিজেল জেনারেটর চালানো হয়। অনলাইন ক্লাস হলে এই ডিজেল সাশ্রয় সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে।

রাজধানীর ধানমন্ডি বা বনানীর মতো এলাকায় সকাল ৮টা ও দুপুর ২টায় যে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, তার বড় কারণ স্কুলগামী ব্যক্তিগত গাড়ি। স্কুলগুলো অনলাইন হলে শুধু ওই এলাকার শত শত গাড়ির কয়েক হাজার লিটার দামী জ্বালানি সাশ্রয় হবে, যা সরাসরি ডলারের অপচয় রোধ করে

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি অনলাইনে নিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদে ইন্টারনেটের বাড়তি খরচ এবং ডিভাইসের সহজলভ্যতা নিয়ে ডিজিটাল বৈষম্য প্রকট হতে পারে। এ ছাড়া ল্যাবরেটরি ভিত্তিক শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক বিকাশে অফলাইন ক্লাসের কোনও বিকল্প নেই।

সংকট উত্তরণে কৌশলগত বিকল্প প্রস্তাবনা
সপ্তাহে তিন দিন অফলাইন এবং দুই দিন অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করা। এতে করে পরিবহন জ্বালানির অপচয় অন্তত ৪০ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন করে ক্লাস সকালের দিকে বা দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময়ে নিয়ে আসা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ফ্যানের বদলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বিএলডিসি ফ্যান এবং এলইডি লাইট নিশ্চিত করা। প্রতিটি স্কুল-কলেজের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ব্যক্তিগত গাড়িতে শিক্ষার্থী আনা-নেয়া নিরুৎসাহিত করে মানসম্মত স্কুল-বাস সার্ভিস চালু করা।

বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় জ্বালানি সাশ্রয় এখন সময়ের দাবি। তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নামে কেবল ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নেয়াই একমাত্র সমাধান নয়। বরং পরিবহন খাতের অপচয় রোধ, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জেনারেটর ব্যবহার কমানো এবং আধুনিক সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করাই হবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *