তরুণ প্রজন্মের চোখে কেমন হবে আগামীর প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): গতকাল ৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান আইসিটি খাত নিয়ে এক বৈপ্লবিক রোডম্যাপ তুলে ধরেছেন। যেখানে বছরে ১০ লাখ কর্মসংস্থান, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে দেয়া হয়েছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। এই ভাষণের তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত মূল দিকগুলো নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী মতামত তুলে ধরা হলো।
তরুণদের চোখে আগামীর বাংলাদেশ: তারেক রহমানের আইসিটি রোডম্যাপ নিয়ে একটি বিশ্লেষণ
৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য সম্ভবত একটি নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছিল। জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক দীর্ঘ ভাষণে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো অনুধাবন করা একজন অভিভাবক হিসেবে কথা বলছেন। আমাদের তরুণরা দীর্ঘদিন ধরে যে স্বপ্ন দেখে আসছিল, তাঁর বক্তব্যে সেই স্বপ্নেরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠেছে।
আইসিটি: কেবল খাত নয়, অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন
তারেক রহমান তাঁর ভাষণে তথ্যপ্রযুক্তিকে ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি অত্যন্ত দূরদর্শীভাবে বলেছেন, ‘‘রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি সবকিছুই এখন তথ্যপ্রযুক্তিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে’’। এই একটি বাক্যই বলে দেয়, তিনি বিশ্ববাজারের পালস কতটা গভীরভাবে বুঝতে পেরেছেন।
১০ লাখ কর্মসংস্থান: আকাশকুসুম কল্পনা নাকি বাস্তব রূপরেখা
অনেকের কাছে বছরে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের কথাটি উচ্চাভিলাষী মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর দেয়া গাণিতিক হিসাবটি অত্যন্ত যৌক্তিক।
সরাসরি উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প: তিনি সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা প্রসেসিং, এআই এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো গভীর প্রযুক্তির শিল্পে বছরে ২ লাখ সরাসরি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছেন।
ফ্রিল্যান্সিং ও ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আমাদের তরুণদের মেধা কাজে লাগিয়ে আরও ৮ লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনাটি সত্যিই প্রশংসনীয়। এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের শিক্ষিত বেকারদের আর বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে রাস্তায় ঘুরতে হবে না।
শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন: শেখার ধরনে আমূল বদল
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছি তাঁর শিক্ষা সংক্রান্ত পরিকল্পনা দেখে। তিনি বলেছেন, হাই স্কুল পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিগ্রির অভাব নেই, কিন্তু দক্ষতার অভাব প্রকট। তারেক রহমানের এই রোডম্যাপ সেই শূন্যতা পূরণ করবে। বিশেষ করে ইংরেজি ও বাংলার পাশাপাশি তৃতীয় একটি আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হলে বিশ্ববাজারে আমাদের ছেলেমেয়েরা সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবে এটি একটি জাদুকরী চিন্তা।
ই-কমার্স ও গ্রামীণ উদ্যোক্তা: স্বপ্ন যখন বিশ্ববাজারের
তারেক রহমান কেবল শহরের তরুণদের কথা ভাবেননি। তিনি কুটির শিল্প এবং এসএমই খাতের পণ্যগুলো আমাজন বা ইবে-র মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এর ফলে ঢাকার বাইরে মফস্বলের একজন সাধারণ কারিগরও তাঁর তৈরি পণ্যটি সরাসরি বিদেশের বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। প্রযুক্তি যখন প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তখনই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও আমাদের মা-বোনদের সুরক্ষা
প্রযুক্তির জোয়ারে অনেক সময় আমরা নৈতিকতা হারিয়ে ফেলি। তারেক রহমান এখানেও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সাইবার বুলিং নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং নারীদের জন্য ডিজিটাল জগত নিরাপদ করার অঙ্গীকার করেছেন। কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ দমনের এই ঘোষণা আজকের দিনে আমাদের মা-বোনদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই রোডম্যাপটি কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের ব্লু-প্রিন্ট। সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে বিনামূল্যে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিটি খাতে তাঁর দেয়া এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নেতৃত্বে চলে আসবে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা এমনই একটি বিজ্ঞানমনস্ক ও মেধাভিত্তিক আগামীর অপেক্ষা করছি।
লেখক: মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা)- প্রতিষ্ঠাতা কিনলে ডটকম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ই-ক্যাব





