এনইআইআর চালু থাকলে রাজস্ব পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা দাঁড়াবে
ক.বি.ডেস্ক: সম্প্রতি সরকার মোবাইল ফোন বেচাকেনা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চালু করেছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর)। এত দিন এই ব্যবস্থা না থাকায় অবৈধ আমদানি ও অনিয়ন্ত্রিত বেচাকেনার সুযোগে সরকার প্রতি বছর অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এনইআইআর কার্যকর হওয়ায় এখন সেই বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের পথ সুগম হয়েছে।
এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০৩০ সালের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে কমপক্ষে ১৫ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে অবৈধ ও চোরাই পথে মোবাইল ফোন আমদানির লাগাম টানাও সম্ভব হবে। এত দিন এসব অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিবছর আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, যার কোনও নির্ভরযোগ্য হিসাবও ছিল না।
আজ মঙ্গলবার (৬ ডিসেম্বর) রাজধানীর একটি স্থানীয় হোটেলে ‘এনইআইআর–এর হাত ধরে শুরু হোক নিরাপদ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি)।
দেশের মোবাইল ফোন শিল্পে স্বচ্ছতা জোরদার, ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি) এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এমআইওবির সভাপতি জাকারিয়া শহীদ, কার্যনির্বাহী সদস্য জিয়া উদ্দিন চৌধুরী, কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, সদস্য সাইফুদ্দিন টিপু, সদস্য জহুরুল হক এবং ইমাম উদ্দিন প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কার্যালয়ে সংঘটিত ভাঙচুরের ঘটনার নিন্দা জানানো হয় এবং এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কিছু অবৈধ স্মার্টফোন ব্যবসায়ীর সহিংস ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যেকোনও নীতিগত মতভেদ শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে সমাধান হওয়া উচিত এবং বৈধ ব্যবসা ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এনইআইআর চালু হওয়ায় ২০২৬ সালে সরকার মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি থেকে অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাবে, এত দিন যা তারা পায়নি। বর্তমানে সরকার মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করছে। এনইআইআর চালু হওয়ায় এই রাজস্ব পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা দাঁড়াবে। আর ২০৩০ সালের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা।
জাকারিয়া শহীদ বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনইআইআর নিয়ে অনেক ধরনের ভুল তথ্য ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এতে মানুষ বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত হচ্ছে। যারা এনইআইআর চালুর বিপক্ষে, তারা ব্যক্তিস্বার্থের জন্য এমন তৎপরতায় জড়িত। অবৈধ উপায়ে মোবাইল ফোন আমদানি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সরকারের কর ফাঁকি সহ অন্তত চারটি আইন ভাঙছেন। অবৈধভাবে মোবাইল ফোনের ব্যবসা করা যায়, এমন নজির বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এর আগেও এনইআইআর চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতির মাধ্যমে সেই উদ্যোগ বন্ধ করা হয়। এখন আবার এই প্রক্রিয়া বন্ধের জন্য অনেকে আন্দোলন করছেন। দেশের স্বার্থে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাই।”
জিয়া উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৩০ হাজার টাকার বেশি মুল্যের মোবাইল ফোন বিক্রির পরিমাণ কম। উৎপাদনের পরিমাণ কম থাকায় মূল্য কমানো যায়নি। যদিও অন্য দেশে এসব মোবাইল ফোনের মূল্য কম। তবে বাংলাদেশে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো গেলে বিভিন্ন মডেলের মোবাইল ফোনের মূল্য আরও কমানো যাবে। এনইআইআর না থাকায় এত দিন এই সুযোগে মুনাফা অর্জন করেছিল বিভিন্ন ব্যক্তি–প্রতিষ্ঠান। এনইআইআর চালু থাকলে স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রিতে বাইরের বিনিয়োগ আরও বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন মার্কেটের অন্তত ২০ শতাংশ অবৈধ কারবারিদের দখলে। তাঁরা একদিকে যেমন সরকারকে রাজস্ব দেন না, আবার যে মোবাইল ফোনগুলো বিক্রি করেন, আনঅফিশিয়াল হওয়ায় সেগুলোয় নানা ধরনের নিরাপত্তা ইস্যু থাকে।”
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, “এনইআইআর চালু না হলে শুধু অবৈধ মোবাইল ফোন আমদানি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাই লাভবান হবেন। আর চালু থাকলে সরকার রাজস্ব পাবে। মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে। তবে যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এনইআইআর চালুর ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে তেমনি মোবাইল ফোন বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। বৈধ ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন, ভোক্তারা পাবেন নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সেবা সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ ডিজিটাল অর্থনীতি শক্তিশালী করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”





