প্রতিবেদন

এনইআইআর কেন প্রয়োজন: আর্থিক শৃঙ্খলা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ডিজিটাল আস্থার ভিত্তি

মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: বাংলাদেশের মোবাইল খাতে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (এনইআইআর) কেবল একটি প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নয় এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল আস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সংস্কার। মোবাইল ফোন আজ যোগাযোগের যন্ত্রের বাইরে গিয়ে মোবাইল ফাইন্যান্স, ডিজিটাল আইডেন্টিটি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি সেবা ব্যবহারের মূল চাবিকাঠি। এই ইকোসিস্টেমে ডিভাইস স্তরে শৃঙ্খলা না থাকলে ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ে।

প্রথমত, অর্থনৈতিক ও রাজস্ব দিক। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গ্রে-মার্কেট ও অবৈধ মোবাইল ফোনের অংশ উল্লেখযোগ্য ছিল। বিভিন্ন শিল্প অনুমান অনুযায়ী, একসময় বাজারের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মোবাইল ফোন বৈধ আমদানির বাইরে আসত। এতে সরকার প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার বেশি শুল্ক ও ভ্যাট হারিয়েছে, আর বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। এনইআইআর চালু হলে অবৈধ ডিভাইস কার্যত অচল হয়ে পড়ে ফলে বৈধ আমদানি বাড়ে, রাজস্ব ঘাটতি কমে এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ফিরে আসে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ডিভাইস ইকোসিস্টেমে বিনিয়োগ ও লোকাল অ্যাসেম্বলিকে উৎসাহিত করে।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। মোবাইল ফোন চুরি বাংলাদেশে নগর অপরাধের একটি বড় অংশ। চুরি হওয়া মোবাইল ফোন যদি দ্রুত ব্লক করা যায় এবং পুনরায় নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা না যায়, তাহলে অপরাধের প্রণোদনা কমে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইএমইআইভিত্তিক ব্লকিং কার্যকর হলে মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একইসঙ্গে, মোবাইল ফোন হারালে বা ছিনতাই হলে ব্যবহারকারীর ব্যাংকিং অ্যাপ, মোবাইল ওয়ালেট, ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য সুরক্ষিত থাকে যা ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বড় উপাদান।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল ফাইন্যান্সের নিরাপত্তা। বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। একটি অবৈধ বা ক্লোনড ডিভাইস দিয়ে আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকি অনেক বেশি। এনইআইআর ডিভাইস-লেভেলে একটি ফিল্টার হিসেবে কাজ করে যা প্রতারণা, সিম ক্লোনিং এবং পরিচয় চুরির ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। ব্যবহারকারীর জন্য এটি সরাসরি আর্থিক নিরাপত্তা জাল।

চতুর্থত, বাজারের শৃঙ্খলা ও ভোক্তা আস্থা। এনইআইআর থাকলে ব্যবহারকারী জানে সে যে মোবাইল ফোনটি কিনছে, সেটি বৈধ, নিরাপদ এবং ভবিষ্যতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে না। এই আস্থা বাজারকে স্থিতিশীল করে। একইসঙ্গে রিটেইলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের জন্য নিয়ম স্পষ্ট হয় কে বৈধ, কে নয়।

পঞ্চমত, ভবিষ্যৎ ডিজিটাল অর্থনীতির প্রস্তুতি। আওটি, স্মার্ট ডিভাইস, ই-সিম, স্মার্ট মিটার এসবই ডিভাইস আইডেন্টিটির ওপর নির্ভরশীল। এনইআইআর এই ভবিষ্যৎ ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে। নিরাপদ ডিভাইস ছাড়া স্মার্ট সিটি বা স্মার্ট সার্ভিস কেবল কাগজেই থাকে।

উল্লেখ্য, আজ বৃহস্পতিবার (১ ডিসেম্বর) থেকে শুরু হচ্ছে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (এনইআইআর) কার্যক্রম। এই ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে মোবাইল ফোনের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। এখন থেকে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে নতুন করে যুক্ত হওয়া যেকোনও অবৈধ বা চোরাই পথে আসা মোবাইল ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও বন্ধ হয়ে যাবে।

তবে একটি শর্ত অপরিহার্য এনইআইআর এর বাস্তবায়ন হতে হবে ব্যবহারবান্ধব ও স্বচ্ছ। দ্রুত রেজিস্ট্রেশন, প্রবাসফেরত বা ব্যক্তিগত ব্যবহারের মোবাইল ফোনে পরিষ্কার নীতি, শক্ত ডেটা সুরক্ষা কাঠামো, এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমস্যা সমাধান না হলে ভালো উদ্যোগও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এনইআইআর কোনও নিয়ন্ত্রণমূলক বোঝা নয়; এটি নিরাপদ বাজার, সৎ ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অবকাঠামো। সঠিক বাস্তবায়নে এনইআইআর বাংলাদেশকে একটি আরও নিরাপদ, আস্থাভিত্তিক ও টেকসই ডিজিটাল অর্থনীতির পথে এগিয়ে নিতে পারে।

লেখক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম- ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড এবং সভাপতি বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতি

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *