ই-কমার্স ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা: রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে যা থাকা জরুরি
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): সরাসরি রাজনীতি না করলেও একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ছাত্রাবস্থা থেকেই রাজনীতির গতিপ্রকৃতি আমি গভীর পর্যবেক্ষণে রাখি। আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করতে হলে দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও বলিষ্ঠ মতামত প্রকাশের কোনও বিকল্প নেই। অনেকেই রাজনীতির আলোচনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন, কিন্তু আমার দর্শন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী আহ্বানে প্রোথিত- “আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে”। পরাধীনতা আর নিশ্চলতা ভেঙে নতুন ভোরে জেগে ওঠার যে আহ্বান কবি জানিয়েছিলেন, বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জাগরণের জন্য তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যানডার্ড (টিবিএস)-এ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকারের একটি তুলনামূলক চিত্র দেখে আমি কিছুটা হতাশ হয়েছি। ২০২৬-এ এসেও যখন দলগুলো কেবল ‘পেপাল’ বা ‘৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি’র মতো পুরনো বুলি শোনায়, তখন আমার কাছে স্পষ্ট মনে হয় যে, তারা এদেশের অনলাইন ব্যবসা, ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতের অমিত সম্ভাবনা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ই-কমার্স খাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকা এবং ই-ক্যাবের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে এই ডিজিটাল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ইকোসিস্টেম আমাদের অর্থনীতির প্রকৃত প্রাণশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
অনলাইন ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শক্তি: ৪টি প্রধান অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
সঠিক নীতিমালা ছাড়াই আমাদের অনলাইন উদ্যোক্তারা দেশে এক নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ বলছে, এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী-
কর্মসংস্থান ও নির্ভরশীলতা: বর্তমানে দেশে ৫ লাখের বেশি সক্রিয় অনলাইন উদ্যোক্তা রয়েছেন। প্রতিটি উদ্যোগে গড়ে ৩ জন করে সরাসরি প্রায় ১৫-২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরিবার সহ প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ মানুষ আজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক তুলনা: ভারতে জাতীয় আয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের অবদান ৩০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৪০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ২৫ শতাংশের এর নিচে। আমি মনে করি, এই খাতকে প্রাধান্য দিয়ে সঠিক নীতিমালা দিলে আগামী ৫ বছরে জাতীয় আয়ে অতিরিক্ত ২ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ করা সম্ভব।
ডিজিটাল পেমেন্ট ও লেনদেন খরচ সাশ্রয়: বর্তমানে দেশে ৮০-৯০ শতাংশ লেনদেন পণ্য হাতে পাওয়ার পর পরিশোধ পদ্ধতিতে হয়, যা ব্যবসার গতি ধীর করে দেয়। আমি নিশ্চিত যে, আধুনিক ফিনটেক গেটওয়ে সহজ করে ডিজিটাল পেমেন্টে ১ শতাংশ আর্থিক সুবিধা বা ইনসেন্টিভ দিলে লেনদেন খরচ বার্ষিক প্রায় ৫০০ কোটি টাকা কমে আসবে।
লজিস্টিক ব্যয়ের প্রভাব: উন্নত বিশ্বে পণ্য পরিবহনের খরচ ৫-৭ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ১৫-২০ শতাংশ। আমি দেখেছি, পণ্যভেদে ডেলিভারি খরচ মূল্যের ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে যায়। যদি সরকারি অবকাঠামো ও ডাক বিভাগ ব্যবহার করে এই খরচ অর্ধেক করা যায়, তবে বছরে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
অনলাইন ব্যবসা পুনর্গঠনে ১২-দফা বিস্তারিত রোডম্যাপ
১. স্মার্ট ট্রেড লাইসেন্স ও ক্যাটাগরি সংস্কার: অনলাইন ব্যবসাকে প্রথাগত ব্যবসার বাইরে আলাদা খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ট্রেড লাইসেন্সে ‘ই-কমার্স’ ক্যাটাগরি সংযুক্ত করা। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে স্মার্ট ও ডিজিটাল করার পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। এখানে বিশেষ দাবি হলো- চালডালের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং একজন ফেসবুক-ভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য একই নীতি বা ফি না রেখে মূলধন ও ব্যবসার আকার অনুযায়ী আলাদা ক্যাটাগরি করা, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে সহজ ও সাশ্রয়ী করবে।
২. জাতীয় অনলাইন উদ্যোক্তা শুমারি: প্রতিটি ক্ষুদ্র ও ফেসবুক ভিত্তিক উদ্যোক্তার সঠিক তালিকা তৈরি করে তাদের ‘ডিজিটাল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং সঠিক ও কার্যকর নীতি প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে যাতে প্রান্তিক উদ্যোক্তারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার আওতায় আসে।
৩. এমএসএমই-র জন্য গ্লোবাল মার্কেট এক্সেস: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত হস্তশিল্প, দেশীয় পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য যেন ফেসবুক বা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা যায়, তার জন্য শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা এবং বিশেষ পরিবহন কাঠামো তৈরি করা।
৪. আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে সহজীকরণ: কেবল পেপালের প্রতীক্ষায় না থেকে স্ট্রাইপ বা পেওনিয়ারের মতো আধুনিক আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়েগুলো বাংলাদেশে সহজলভ্য করা। এতে ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম হবে।
৫. লজিস্টিক ও ডেলিভারি কস্ট মডার্নাইজেশন: ডাক বিভাগকে আধুনিকায়ন করে সারা দেশে অনলাইন পণ্য ডেলিভারির মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তোলা। এই খরচ কমাতে প্রতিটি জেলায় সরকারি ই-কমার্স কেন্দ্র বা গুদাম তৈরি করা জরুরি, যা সরাসরি কৃষকের বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পণ্য সংরক্ষণ করবে।
৬. জামানতবিহীন ‘স্মার্ট লোন’: স্থাবর সম্পত্তির বদলে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য দেখে অনলাইন এমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা। ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে আলাদা নীতিমালা প্রবর্তন করা।
৭. কনজ্যুমার প্রোটেকশন ও আইনি সুরক্ষা: ই-কমার্স খাতের আস্থার সংকট দূর করতে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ট্রাইব্যুনাল গঠন। এটি ক্ষুদ্র বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয় পক্ষকেই দ্রুত আইনি সুরক্ষা দেবে এবং অসাধু চক্রের হাত থেকে খাতটিকে রক্ষা করবে।
৮. এসএমই দক্ষতা ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং: নামসর্বস্ব তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ বন্ধ করে ডিজিটাল মার্কেটিং, তথ্য বিশ্লেষণ, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট এবং আধুনিক বৈশ্বিক প্যাকেজিংয়ের ওপর ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ প্রদান।
৯. সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ: আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। এতে স্থানীয় এমএসএমই উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত মান বাড়বে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হওয়া সহজ হবে।
১০. আমলাতান্ত্রিক সমন্বয় ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা দূর করা। উদ্যোক্তাদের জন্য একটি একক ডিজিটাল পোর্টাল চালু করা, যেখানে লাইসেন্স থেকে শুরু করে লোন ও ট্যাক্স সংক্রান্ত সব সমাধান পাওয়া যাবে।
১১. কর অবকাশ ও বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা: নতুন ও ক্ষুদ্র অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম ৫-১০ বছর কর অবকাশ (ট্যাক্স হলিডে) নিশ্চিত করা। যারা শতভাগ দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছেন, তাদের জন্য বিশেষ রপ্তানি প্রণোদনা রাখা।
১২. স্বচ্ছতা ও নিয়মিত পাবলিক অডিট: এমএসএমই এবং আইসিটি খাতের উন্নয়নে বরাদ্দকৃত বাজেটের সুফল কারা পাচ্ছেন সে বিষয়ে প্রতি বছর শ্বেতপত্র প্রকাশ। প্রতিটি প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে এবং ব্যর্থ প্রকল্পের জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
চাটুকারমুক্ত নেতৃত্ব এবং আমাদের প্রত্যাশা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো যারা এতোদিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থেকে এই সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে ধ্বংসের পথে নিয়ে গেছে, তারাই আবার ‘ভবিষ্যৎ নেতাদের’ চারপাশে প্রস্তুতি নিয়ে ভিড় করছেন। আমার ভয়টা আসলে এখানেই। এই সুযোগ সন্ধানীদের কথা শুনে যদি আগামী দিনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তবে আমাদের পরিবর্তনটা কীভাবে হবে?
আমরা চাই ক্ষমতার শীর্ষে যারা থাকবেন, তাঁরা চাটুকারদের তৈরি ‘কাঁচের ঘরে’ বসে না থেকে বাইরে বেরিয়ে আসুক, দেয়ালের লিখন পড়ুক এবং সরাসরি স্টেকহোল্ডারদের কথা শুনে জনগণের আকাঙ্ক্ষা বোঝার চেষ্টা করুক। আমি মনে করি, রাজনৈতিক নেতাদের যতোটা ভালো ‘বক্তা’, তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো ‘শ্রোতা’ হতে হবে। আমি প্রচন্ড আশাবাদী একজন মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করি, আমাদের এবারের এই সুযোগের সদ্ব্যবহার আমরা করব। প্রত্যাশা করব রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের হতাশ করবে না।
লেখক: মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা)- প্রতিষ্ঠাতা কিনলে ডটকম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ই-ক্যাব





