শব্দের রাজনীতি থেকে স্মার্ট রাজনীতি: স্মার্ট নির্বাচন এখন আপনার হাতে
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): জনগণ এবং রাষ্ট্রের সরাসরি যোগাযোগই হলো গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। ৩০০টি সংসদীয় আসনে হাজার হাজার প্রার্থীর অংশগ্রহণে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন এক বিশাল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের দেশে মাঠের সভা বা উঠান বৈঠক ছিল সাধারণ মানুষের কথা বলা এবং প্রার্থীর দায়বদ্ধতার এক অকৃত্রিম মাধ্যম। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা সেই জনসংলাপ সংস্কৃতিকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার এক অনন্য সুযোগ পেয়েছি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং আমাদের প্রচারণাকে প্রযুক্তিনির্ভর, দৃষ্টিনন্দন এবং জনবান্ধব করার এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ।
মান্ধাতা আমলের প্রচারণা বনাম আধুনিক ডিজিটাল প্রচারণা
সনাতন প্রচারণার নেতিবাচক দিকগুলো সরিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে যা যা পরিবর্তন আনা সম্ভব এবং কীভাবে জনদুর্ভোগ কমানো যায়-
শব্দদূষণ রোধ: মান্ধাতা আমলে সারাদিন উচ্চশব্দে মাইকিং ও স্লোগান দেয়া হতো। স্মার্ট প্রচারণায় শব্দহীন ব্যক্তিগত অডিও মেসেজ (আইভিআর) এবং পডকাস্টের মাধ্যমে সরাসরি ভোটারের কানে বার্তা পৌঁছে দেয়া হবে।
যানজট নিরসন: আগে গুরুত্বপূর্ণ মোড় বন্ধ করে বিশাল জনসভা হতো। এখন ভার্চুয়াল টাউন হল ও ডিজিটাল লাইভ সেশনের মাধ্যমে জনসমাগম ছাড়াই বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ করা সম্ভব।
পরিবেশ সংরক্ষণ: কোটি কোটি প্লাস্টিক লেমিনেটেড পোস্টারের বদলে এখন এলইডি স্ক্রিন, কিউআর কোড এবং ডিজিটাল কার্ড ব্যবহার করে বর্জ্যমুক্ত প্রচারণা চালানো সম্ভব।
ব্যয় সংকোচন: বিশাল জনবল ও কাগুজে প্রচারণার বিপুল খরচের তুলনায় ডিজিটাল প্রচারণা প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয়ী।
সাধারণ জনগণকে সমস্যায় না ফেলে সময়োপযোগী প্রচারণার মাধ্যম
নির্বাচনী প্রচার যেন নাগরিকের বিরক্তির কারণ না হয়ে তথ্যের উৎস হয়, সেজন্য যে মাধ্যমগুলো অত্যন্ত কার্যকর-
স্মার্ট নোটিফিকেশন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভোটারের পছন্দ ও পেশা অনুযায়ী নির্দিষ্ট তথ্য পাঠানো। যেমন: কৃষককে কৃষিনীতি এবং তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিষয়ক পরিকল্পনা পাঠানো।
ভার্চুয়াল টাউন হল: জুম বা সোশ্যাল মিডিয়া লাইভের মাধ্যমে সরাসরি সংলাপ আয়োজন করা, যেখানে ভোটাররা ঘরে বসেই প্রার্থীর কাছে এলাকার সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন।
এআই চালিত স্মার্ট চ্যাটবট: প্রার্থীর ‘ডিজিটাল প্রতিনিধি’ হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার চ্যাটবট ২৪/৭ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলবে এবং প্রার্থীর পরিকল্পনা জানাবে।
অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) ইশতেহার: কাগজের লিফলেটের বদলে কিউআর কোড স্ক্যান করলে ফোনের স্ক্রিনে প্রার্থীর থ্রি-ডি মডেল ভেসে ওঠবে এবং প্রার্থীর হলফনামা ও পরিকল্পনাগুলো পড়ে শোনাবে।
মানবিক উপস্থিতি ও সহানুভূতির ডিজিটাল ভাষা
নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত হয়ে মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানো একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি কেবল ভোটের কৌশল নয়, বরং মানুষের বিপদে বা উৎসবে পাশে দাঁড়ানোর একটি আধুনিক রূপ। ২০২৬-এর নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য ডিজিটাল মিডিয়া হবে মানুষের সঙ্গে আবেগীয় সম্পর্ক তৈরির অন্যতম হাতিয়ার। সংকটকালে প্রার্থীর একটি ভিডিও বা অডিও বার্তা ভোটারদের আশ্বস্ত করতে হাজারও কাগুজে বক্তৃতার চেয়েও বেশি কার্যকর।
আধুনিক নির্বাচনের জন্য নতুন ও বিশেষ কৌশলগত সুপারিশ
নির্বাচনটিকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও নির্ভুল করতে নতুন এবং উদ্ভাবনী পদক্ষেপগুলো যুক্ত করা-
আঞ্চলিক ভাষায় এআই কন্টেন্ট: বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা বা উচ্চারণে এআই চ্যাটবট ও ভিডিও বার্তা প্রস্তুত করা, যা সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রার্থীর আত্মিক সংযোগ গভীর করবে।
হাইপার-লোকাল জিও-ফেন্সিং: ভোটার যখন এলাকার নির্দিষ্ট কোনও গুরুত্বপূর্ণ স্থান (যেমন: বাজার বা ব্রিজ) অতিক্রম করবেন, তখন তার ফোনে ওই নির্দিষ্ট স্থানের উন্নয়ন নিয়ে প্রার্থীর ভিডিও পরিকল্পনা পৌঁছে যাবে।
ডিজিটাল ইশতেহার ট্র্যাকার: নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো প্রার্থী কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন, তার একটি ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি ট্র্যাকার’ অ্যাপে রাখা, যা ভোটারের আস্থা বৃদ্ধি করবে।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) উন্নয়ন ট্যুর: এলাকার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে ভোটারদের দেখানো, যাতে তারা ঘরে বসেই দেখতে পাবেন আগামী ৫ বছরে তাদের এলাকাটি কেমন হবে।
ভেরিফাইড ডিজিটাল সিল: ডিপফেক বা অপপ্রচার রোধে প্রতিটি প্রার্থীর ভিডিওতে একটি ইউনিক ‘ডিজিটাল সিল’ বা ওয়াটারমার্ক নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষ কোনও গুজব দেখে বিভ্রান্ত না হয়।
স্মার্ট নির্বাচনের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
গ্যামিফাইড ইশতেহার: প্রার্থীর ইশতেহারকে ছোট মোবাইল গেম বা কুইজ আকারে প্রকাশ করা, যাতে তরুণ ভোটাররা খেলার মাধ্যমে প্রার্থীর পরিকল্পনা জানতে পারেন।
লোকাল ওয়াই-ফাই হাব: প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় নির্দিষ্ট পয়েন্টে ফ্রি ‘ক্যাম্পেইন ওয়াই-ফাই’ জোন করা, যেখানে কানেক্ট করলেই প্রার্থীর তথ্য সম্বলিত পোর্টাল দেখা যাবে।
ব্লকচেইন ও স্বচ্ছতা: নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
ডিজিটাল ভলান্টিয়ার: প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় প্রযুক্তি-সচেতন তরুণদের নিয়োগ দেয়া, যারা প্রবীণ ভোটারদের ডিজিটাল তথ্য পেতে সাহায্য করবেন।
খরচ, পরিবেশ ও কার্যকারিতার উপাত্ত
৩০০টি সংসদীয় আসনে ডিজিটাল প্রচারণার উপযোগিতা পরিসংখ্যানের নিরিখে অত্যন্ত উচ্চ-
ব্যয় সংকোচন: ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রচারণার মাধ্যমে নির্বাচনী খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
পরিবেশ রক্ষা: প্লাস্টিক ও কাগজের ব্যবহার বন্ধ করে একটি ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা সম্পূর্ণ বর্জ্যহীন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব।
ভোটার অংশগ্রহণ: প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়, যা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি ১০ থেবে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
সফলতার হার: বাংলাদেশের ১৩ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারীর বিশাল বাজারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই এখন তথ্য পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
ডিজিটাল প্রচারণা কেবল আধুনিকতার প্রদর্শনী নয়, বরং এটি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পরিবেশবান্ধব নেতৃত্বের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যে নেতা প্রযুক্তির এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত না করে তাদের হৃদস্পন্দন বুঝতে পারবেন, তিনিই হবেন আগামীর প্রকৃত স্মার্ট লিডার। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি- ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হোক কাগজের জঞ্জাল আর শব্দের বিভ্রাট সরিয়ে মেধা ও প্রযুক্তির এক সৃজনশীল লড়াই।





