বিএনপি-এর নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬: ডিজিটাল অর্থনীতি ও ই-কমার্স রূপরেখা
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতেহারগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ঘোষিত ইশতেহারে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ই-কমার্স খাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যেখানে ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তাদের এবং অনলাইন ব্যবসায়ীদের কথা উল্লেখ আছে।
১. ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা
বিএনপি তাদের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ ইশতেহারে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ স্লোগানকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত এই ইশতেহারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্য অর্জনে ৫ লাখ অনলাইন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জিডিপিতে অবদান বর্তমানের ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
পরামর্শ: জিডিপিতে এই খাতের অবদান নিশ্চিত করতে ই-কমার্সকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘রপ্তানি খাত’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে তারা বড় শিল্প কারখানার মতো সমান রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও সুবিধা পায়।
২. পেপাল ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে নিশ্চিতকরণ
ইশতেহারের অন্যতম বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি হলো দেশ পরিচালনায় প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম পেপাল বাংলাদেশে সরাসরি চালু করা। এর ফলে ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পেমেন্ট পেতে যে জটিলতা ও অতিরিক্ত খরচ হয়, তা দূর হবে। বার্ষিক প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত রেমিট্যান্স সরাসরি বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসার পথ সুগম হবে।
পরামর্শ: পেপাল চালুর পাশাপাশি ‘ন্যাশনাল ডিজিটাল ওয়ালেট’ (যা ইশতেহারে ৬ মাসের মধ্যে চালুর কথা বলা হয়েছে) এর সঙ্গে একে সরাসরি ইন্টিগ্রেট করা।
৩. গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম (অ্যামজন, আলিবাবা) ও আঞ্চলিক ই-কমার্স হাব
বিএনপি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী ই-কমার্স এবং এভিয়েশন হাবে রূপান্তর করতে চায়। ইশতেহারে অ্যামজন, আলিবাবা ও ই-বে এর মতো প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের এসএমই উদ্যোক্তাদের সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর পণ্য আদান-প্রদানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা হবে।
পরামর্শ: ডাক বিভাগকে ‘স্মার্ট লজিস্টিক সেন্টার’-এ রূপান্তর করে ডেলিভারি খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা এবং জেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে ‘শেয়ারড ওয়্যারহাউস’ স্থাপন করা।
৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি দ্যোক্তাদের আর্থিক সুরক্ষা ও ঋণ
৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মূলধনের সমস্যা সমাধানে ইশতেহারে চিরাচরিত বন্ধক-নির্ভর ঋণের পরিবর্তে ‘ক্যাশ-ফ্লো বেজড লোন’ (ব্যবসায়িক লেনদেন ভিত্তিক ঋণ) চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ ছাড়াও স্টার্টআপদের জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি স্কিম, জেলা পর্যায়ে ক্যাপিটাল ফান্ড এবং ক্রাউডফান্ডিং ও বিমার আইনি কাঠামো তৈরির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
পরামর্শ: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি কমাতে ইশতেহারে বর্ণিত উদ্যোক্তা সুরক্ষার অধীনে ‘ক্ষুদ্র বীমা’ ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা।
৫. ডিজিটাল অবকাঠামো, ফ্রি ইন্টারনেট ও ১০ লাখ কর্মসংস্থান
বিএনপি আগামী ৫ বছরে আইটি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ডিজিটাল সেন্টার এবং প্রধান জনাকীর্ণ এলাকায় ফ্রি হাই-স্পিড ইন্টারনেট প্রদান করা হবে। মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষা এবং বৈশ্বিক বাজারের জন্য তৃতীয় ভাষা (জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন ইত্যাদি) শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
৬. আইনি সুরক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কার
বর্তমান সময়ের বিতর্কিত ও দমনমূলক সাইবার আইনগুলো সংস্কারের মাধ্যমে অনলাইন ব্যবসার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা ইশতেহারে বলা হয়েছে। অনলাইন ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ইলেকট্রনিক বিচার ব্যবস্থা বা স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে।
পরামর্শ: সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য জটিল ট্রেড লাইসেন্সের পরিবর্তে একটি সহজ ‘ডিজিটাল উদ্যোক্তা আইডি’ চালু করা। এ ছাড়া সরকারি কেনাকাটার একটি নির্দিষ্ট অংশ নিবন্ধিত অনলাইন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে নেয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা।
৭. ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ও ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি
ইশতেহারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে রপ্তানি শুল্ক সহজীকরণ এবং বিশেষ কার্গো সুবিধার কথা বলা হয়েছে। ৫ লাখ উদ্যোক্তার তৈরি পণ্য যেন সহজে বিদেশে পাঠানো যায়, সেজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বা ‘ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি’ জোরদার করা হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টেকসই ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক প্রভাব।

বিএনপি-এর ২০২৬ সালের ইশতেহারের লক্ষ্যগুলোকে আরও সুসংহত এবং ৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুফল নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পয়েন্টগুলো পলিসি হিসেবে সংযুক্ত করা যেতে পারে-
ডিজিটাল কমার্স ওম্বুডম্যান (Ombudsman) ও দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি: ই-কমার্স খাতে ক্রেতা-বিক্রেতার আস্থার ঘাটতি দূর করতে একটি স্বতন্ত্র ন্যায়পাল নিয়োগ করা। এটি কার্যকর হলে বিরোধ নিষ্পত্তির সময় ৭০ শতাংশ কমে আসবে, যা বাজারে লেনদেনের গতি বৃদ্ধি করে বার্ষিক অতিরিক্ত ৫০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করবে।
স্মার্ট শেয়ারড কোল্ড-স্টোরেজ ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক: পচনশীল পণ্য (যেমন: মধু, ঘি, অর্গানিক পণ্য) নিয়ে কাজ করা উদ্যোক্তাদের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে কোল্ড-স্টোরেজ হাব স্থাপন। এটি পোস্ট-হারভেস্ট লস ২০ শতাংশ কমানোর মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের নিট মুনাফা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে।
নারীদের জন্য ‘রিস্টার্ট ফান্ড’ ও মাতৃত্বকালীন কর রেয়াত: ৫ লাখ উদ্যোক্তার প্রায় ৪০ শতাংশ নারী। মাতৃত্বকালীন বিরতির পর ব্যবসায় ফেরার জন্য বিশেষ ‘রিস্টার্ট ফান্ড’ এবং ওই সময়ের জন্য ট্যাক্স হলিডে প্রদান করা।
পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ভর্তুকি: পাটের তৈরি বা পচনশীল প্যাকেজিং ব্যবহারের জন্য উদ্যোক্তাদের বিশেষ ভর্তুকি প্রদান, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ‘এথিক্যাল বিজনেস’ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে।
এআই-চালিত মার্কেট অ্যানালিটিক্স ডেটা সেন্টার: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে উদ্যোক্তাদের বিনামূল্যে বৈশ্বিক চাহিদার পূর্বাভাস দেয়া। এর ফলে অবিক্রিত পণ্যের অপচয় ৪০ শতাংশ কমে আসবে এবং রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
ডিজিটাল সার্টিফিকেশন ও কিউসি ল্যাব: উপজেলা পর্যায়ে সরকারি মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব স্থাপন, যা অ্যামজন বা আলিবাবা-তে পণ্যের মূল্য ও গ্রহণযোগ্যতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে।
ব্লকচেইন ভিত্তিক সাপ্লাই চেইন: লেনদেন ও পণ্য ডেলিভারিতে শতভাগ স্বচ্ছতা ফেরাতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার, যা স্টার্টআপগুলোতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বিএনপির এই নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে এই আধুনিক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণগুলো যুক্ত হলে তা কেবল একটি রাজনৈতিক ইশতেহার থাকবে না; বরং এটি হবে বাংলাদেশের ৫ লাখ উদ্যোক্তা ও ৩০ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির একটি ব্লু-প্রিন্ট।
লেখক: মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা)- প্রতিষ্ঠাতা কিনলে ডটকম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ই-ক্যাব





