এক ক্লিকে নিরাপদ, অ্যাপ ছাড়া বিপদ- রাইডে কেন বাড়ছে ঝুঁকি?
ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ (তুষার): বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে রাইড–শেয়ারিং অ্যাপ যেভাবে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত সহজ করেছে, ঠিক তেমনই অ্যাপের বাইরে বাইক রাইড নেয়ার প্রবণতাও দ্রুত বাড়ছে। অনেকে মনে করেন অ্যাপ ছাড়াই নিলে ভাড়া কম, সময় বাঁচে। কিন্তু বাস্তবে এর ফলে যাত্রীই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। তবে অ্যাপনির্ভর নিরাপত্তার বাইরে গিয়ে যখন যাত্রীরা অ্যাপ ছাড়া বাইক নেন তখন তা যাত্রী ও চালক উভয়ের জন্যই গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কবার্তা এবং যাত্রীদের অভিজ্ঞতা থেকে ওঠে এসেছে কয়েকটি দিক, যা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
অ্যাপের বাইরে রাইড কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
পরিচয় যাচাইয়ের কোন নিশ্চয়তা নেই: অ্যাপের ভিতরে চালকের জাতীয় পরিচয়পত্র, লাইসেন্স, ছবি, ফোন নম্বর এবং বাইক রেজিস্ট্রেশন সবই যাচাই করা থাকে। অ্যাপের বাইরে এসব তথ্য একটিও যাচাই করার সুযোগ নেই। ফলে ছদ্মবেশে প্রতারণা বা অপরাধ সংঘটনের সুযোগ তৈরি হয়। অপরাধীরা সবচেয়ে সহজে সুবিধা পায় তখনই, যখন যাত্রীর পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না
যাত্রীর অবস্থান ট্র্যাক হয় না: অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীর রুট, লাইভ লোকেশন এবং রাইড ইতিহাস সিস্টেমে সংরক্ষণ থাকে। অ্যাপের বাইরে রাইড নিলে কেউ জানেই না যাত্রী কোথায় যাচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে ৯৯৯ বা অ্যাপ-সাপোর্ট রাইড লোকেশন এমনকি জরুরি প্রয়োজনে সহায়তা পাওয়াও অসম্ভব হয়। অনেক ছিনতাই বা হয়রানির ঘটনায় দেখা যায়, যাত্রীর নেয়া বাইকটি ‘নন-অ্যাপ রাইড’ হওয়ায় শনাক্ত করা যায়নি।
দুর্ঘটনা হলে দায় নেবেন কে: অ্যাপের ভেতরে প্রতিষ্ঠান চালক ও যাত্রীর মাঝে বিরোধ মেটায়। ইনস্যুরেন্স কাভারেজ থাকে। দুর্ঘটনা/হয়রানির মামলায় তথ্যদাতা হিসেবে অ্যাপ কাজ করে। যাত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। অ্যাপ ছাড়া রাইডে যাতায়াতের ক্ষেত্রে রাইড প্রতিষ্ঠান কোনেও দায়ভার নেবেনা কারণ কোনও রাইড রেকর্ড নেই। ইনস্যুরেন্স সুবিধা বা সাপোর্ট অ্যাপের বাইরের রাইডে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই দুর্ঘটনায় চিকিৎসা খরচ বা ক্ষতিপূরণ আদায় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই হয়রানি, মারধর, প্রতারণা বা ছিনতাই কিছুই প্রমাণ করতে পারবেন না।
ভাড়া নিয়ে প্রতারণা ও তর্কের সম্ভাবনা বেশি: অ্যাপ রাইডে ভাড়া নির্ধারণ হয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কিন্তু অ্যাপ ছাড়া রাইডে ভাড়া নিয়ে তর্ক, অতিরিক্ত টাকা দাবি করা, এমনকি ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটে থাকে।
নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বেশি: অনেক ঘটনার প্রতিবেদনে দেখা গেছে অ্যাপবিহীন রাইডে হয়রানি, রুট পরিবর্তন, ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ বেশি। অ্যাপে থাকা জরুরি এসওএস বাটন বা কল-সাপোর্ট অ্যাপের বাইরে পাওয়া যায় না।
চালকদের জন্যও ঝুঁকি কম নয়
পরিচিতি না থাকার কারণে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা: অ্যাপ যাত্রীর পরিচয় সংরক্ষণ করে। অ্যাপ ছাড়া যাত্রী নিলে চালকের নিজের নিরাপত্তারও নিশ্চয়তা থাকে না।
ভাড়া না দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা: অ্যাপে যাত্রী ভাড়া না দিতে পারলে রিপোর্ট করা যায়, কোম্পানি সমাধান দেয়। অ্যাপের বাইরে রাইডে এ ধরনের প্রতারণা প্রায়ই ঘটে। তাই রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান কোনও সমাধান বা দায়ভার নিবে না।
আইনগত জটিলতা: নিবন্ধনবিহীন রাইড দেয়াকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা অনেক সময় অবৈধ পরিবহন সেবা হিসেবে দেখে থাকে। জরিমানা বা বাইক আটক হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
অ্যাপ ছাড়া কখনোই বাইক রাইড নেবেন না। পরিচয়হীন চালক মানেই অজানা ঝুঁকি। রাইড শুরু করার আগে ওটিপি বা পিন মেলান। অন্য কেউ চালক সেজে রাইড নিতে পারে, যা বড় ঝুঁকি তৈরি করে। লাইভ লোকেশন পরিবার/বন্ধুকে শেয়ার করে রাখুন। অ্যাপের সেফটি ফিচার ব্যবহার করুন। রাতের বেলায় অপরিচিত বা আনঅফিশিয়াল রাইড নেবেন না। বিশেষ করে নারী যাত্রীরা আরও সতর্ক থাকুন। হেলমেট ছাড়া কখনও উঠবেন না কারণ, নিরাপত্তার প্রথম ধাপ হলো হেলমেট।
কেন অ্যাপ-ভিত্তিক রাইডই নিরাপদ
চালকের পরিচয়ভিত্তিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। রাইড হিস্ট্রি এবং ট্র্যাকিং সুবিধা রয়েছে। বিল্ট-ইন এসওএস/ ইমার্জেন্সি বাটন রয়েছে। ইনস্যুরেন্স কভারেজ থাকছে। যাত্রী–চালক উভয়ের রেটিং সিস্টেম থাকছে। প্রতিষ্ঠানের সাপোর্ট সেন্টার ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। এগুলোই অ্যাপ-ভিত্তিক রাইডকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ করে।
ব্যস্ততা বা কম ভাড়ার আশায় অ্যাপবিহীন রাইড নেয়া অনেকেই স্বাভাবিক মনে করেন। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হলে এক মুহূর্তে সব সুবিধা অর্থহীন হয়ে যায়। অ্যাপ ছাড়া রাইড মানে, নিজেকে ঝুঁকির হাতে তুলে দেয়া। অ্যাপের মাধ্যমেই রাইড নিন, এটাই যাতায়াতের সবচেয়ে নিরাপদ, প্রমাণযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত উপায়। অ্যাপের বাইরে রাইড নেয়া হয়তো এক মুহূর্তে সুবিধাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকে বড় ধরনের ঝুঁকি চুরি, ছিনতাই, হয়রানি, দুর্ঘটনা কিংবা আইনগত ঝামেলা। নিজের নিরাপত্তার জন্য অ্যাপ ছাড়া কোনো রাইড নয় এই অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।





