প্রতিবেদন

এআই ব্যবহারে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) কেবল শৌখিন প্রযুক্তি নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এআই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও কাজ শুরু হয়েছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির এই জোয়ার সামলানোর মতো প্রস্তুতি আমাদের ঠিক কতটা আছে, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অক্সফোর্ড ইনসাইটস এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, সম্ভাবনার বড় সুযোগ থাকলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সঠিক নীতিমালার অভাব আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রস্তুতির বর্তমান চিত্র ও বৈশ্বিক অবস্থান
অক্সফোর্ড ইনসাইটস-এর ‘গভর্নমেন্ট এআই রেডিনেস ইনডেক্স’ অনুযায়ী, সরকারি পর্যায়ে এআই ব্যবহারের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৭৪তম। এই হিসাব থেকে বোঝা যায় যে, দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় আমরা এখনও অনেকটা পিছিয়ে আছি। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এআই-এর ব্যবহার বাড়লেও জাতীয় পর্যায়ে এটি কীভাবে কাজ করবে, তার কোনও পরিষ্কার পরিকল্পনা এখনও পাওয়া যায়নি। বর্তমানে ‘জাতীয় এআই নীতিমালা ২০২৪’-এর খসড়া তৈরির কাজ চলছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই নীতিমালা তৈরিতে দেরি হওয়ার কারণে একদিকে যেমন প্রযুক্তির অপব্যবহার বাড়ছে, অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টারের সীমাবদ্ধতা
এআই চালানোর জন্য সবচাইতে জরুরি হলো বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘রেসপনসিবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর বাংলাদেশ: পলিসি অ্যান্ড ডিজাইন চ্যালেহঞ্জেস’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী ডেটা সেন্টার এবং অফলাইন ডেটাবেজের বড় অভাব রয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশের বেশিরভাগ তথ্যই বিদেশি সার্ভারে জমা থাকে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজেদের প্রযুক্তিতে ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া এআই ব্যবহারের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা এখনও কেবল শহর এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সার্বভৌম এআই ও নিজস্ব মডেলের গুরুত্ব
অবকাঠামোর আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে এখন ‘সার্বভৌম এআই’ বিষয়টি খুব গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ যদি কেবল চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো বিদেশি মডেলের ওপর নির্ভর করে থাকে, তবে আমাদের দেশের গোপন তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এর পরিবর্তে বাংলাদেশের নিজস্ব ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (এলএলএম) তৈরি করা দরকার। এটি এমন একটি প্রযুক্তি হবে যা বাংলা ভাষার বৈচিত্র্য এবং আমাদের নিজস্ব প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করবে। এতে করে বিদেশের ওপর আমাদের নির্ভরতা কমবে এবং তথ্যের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

জাতীয় এআই নীতিমালা ২০২৪: মূল লক্ষ্যসমূহ
সরকারের আইসিটি বিভাগ যে ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৪’ (ড্রাফট) তৈরি করেছে, তা মূলত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ লক্ষ্য পূরণের একটি পরিকল্পনা। এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো এআই প্রযুক্তির সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক উন্নতি করা।

এই খসড়া নীতিমালাটি প্রধানত ৬টি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি-
১. সামাজিক সাম্য ও ন্যায্যতা: এআই সিস্টেম যেন কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা লিঙ্গের প্রতি বৈষম্য না করে।
২. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: এআই কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা পরিষ্কার থাকতে হবে এবং এর ফলাফলের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা: নাগরিকদের তথ্যের সুরক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৪. টেকসই উন্নয়ন (সবুজ এআই): পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর যেন দীর্ঘমেয়াদী ভালো প্রভাব থাকে। এক্ষেত্রে সবুজ এআই বা গ্রিন এআই-এর ধারণা আনা হয়েছে, যাতে ডেটা সেন্টারগুলো পরিবেশের ক্ষতি না করে এবং কম বিদ্যুৎ খরচ করে।
৫. অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা: সরকারি, বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করা।
৬. মানুষকে প্রাধান্য দেয়া: প্রযুক্তি যেন মানুষের বিকল্প না হয়ে বরং মানুষের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।

প্রস্তাবিত নতুন উদ্যোগ ও আইনি ব্যবস্থা
নীতিমালাটিতে একটি জাতীয় এআই সেন্টার স্থাপন, বড় পর্যায়ের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন এবং প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই গবেষণা কেন্দ্র ও ইন্টার্নশিপ চালু করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকার একটি শক্তিশালী এআই অ্যাক্ট বা এআই আইন তৈরির কাজও হাতে নিয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে এআই প্রযুক্তিকে এর ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী আলাদা করা হবে। বিশেষ করে ডিপফেক ব্যবহার করে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি বা রাজনৈতিক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির নিয়ম রাখা হচ্ছে। এছাড়া এআই দিয়ে তৈরি কোনও ছবি বা ভিডিও যেন সহজেই চেনা যায়, সেজন্য ডিজিটাল ওয়াটারমার্কিং বা বিশেষ চিহ্ন দেয়া বাধ্যতামূলক করার আলোচনা চলছে।

নৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ইশতিয়াক আহমেদ বলেছেন, এআই তৈরির সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদম যেন একপেশে বা পক্ষপাতদুষ্ট না হয়।
ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. শরিফা সুলতানা উল্লেখ করেছেন যে, আইটি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এই বৈষম্যের কারণে এআই মডেলে তথ্যের ভুল থাকতে পারে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক সমস্যা আরও বাড়াতে পারে। তাই সরকারি ও বেসরকারি সব ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সময় মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ থাকা খুবই জরুরি।

দক্ষ জনবল ও মানুষের কাজ হারানোর ভয়
অগমেডিক্স বাংলাদেশের প্রধান রাশেদ মুজিব নোমান মনে করেন, পড়াশোনা এবং কর্মক্ষেত্রের মধ্যে যে বড় দূরত্ব আছে তা কমাতে হবে। এর বাইরে একটি বড় দুশ্চিন্তা হলো এআই-এর কারণে মানুষের কাজ কমে যাওয়ার ভয়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও সেবা খাতের সাধারণ শ্রমিকদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

এই ঝুঁকি কমাতে বিশেষজ্ঞরা এআই ট্যাক্স বা বিশেষ কর ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এই করের টাকা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের নতুন কাজে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বাস্তবায়নের প্রধান বাধাগুলো
নীতিমালা কার্যকর করতে গিয়ে কিছু বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে-
১. উন্নত কারিগরি ব্যবস্থা ও সুপার কম্পিউটিং সক্ষমতার অভাব।
২. মেধাবী ও দক্ষ বিশেষজ্ঞদের বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা।
৩. সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব।
৪. বড় টেক কোম্পানিগুলোর ডেটা পলিসির সঙ্গে আমাদের দেশের আইনের মিল করা।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতসমূহ
সরকার কিছু বিশেষ খাতকে এআই ব্যবহারের জন্য বেছে নিয়েছে। যেমন: স্মার্ট বিচার বিভাগ (মামলার জট কমাতে), কৃষি (আবহাওয়ার খবর ও ফসলের রোগ ধরা), জনসেবা এবং স্বাস্থ্যসেবা (দ্রুত রোগ নির্ণয়)।

বিশ্লেষণ: এক নজরে বাংলাদেশের এআই রোডম্যাপ
এই পরিকল্পনা সফল করতে সরকার একটি রোডম্যাপ বা পথনকশা তৈরি করছে। এর ধাপগুলো হলো-
স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য (২০২৪-২০২৫): এআই নীতিমালা ও আইন চূড়ান্ত করা এবং জাতীয় এআই সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে গবেষণার কাজ শুরু করা।
মধ্যমেয়াদী লক্ষ্য (২০২৬-২০৩০): কৃষি, স্বাস্থ্য ও সরকারি সেবায় এআই-এর পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলো পুরোপুরি চালু করা এবং অন্তত ৫ লক্ষ মানুষকে এআই ও ডেটা সায়েন্সে দক্ষ করে তোলা।
দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য (২০৩১-২০৪১): নিজেদের এআই মডেলের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং বিশ্বের বাজারে এআই সেবা বিক্রি করে আয় করা।

বাংলাদেশ আজ ডিজিটাল থেকে স্মার্ট হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যাত্রায় এআই হবে আমাদের প্রধান হাতিয়ার। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল বিদেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের উদ্ভাবক হতে হবে। অক্সফোর্ড ইনসাইটস-এর কম র‍্যাংকিং বা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা আমাদের জন্য বাধা নয়, বরং নিজেকে আরও ভালো করে তৈরির সুযোগ। শক্তিশালী ডেটা সেন্টার, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশও এই এআই বিপ্লবের পুরো সুফল পাবে।

তথ্যসূত্র: অক্সফোর্ড ইনসাইটস: গভর্নমেন্ট এআই রেডিনেস ইনডেক্স; আইসিটি বিভাগ: ড্রাফট ন্যাশনাল এআই পলিসি ২০২৪ এবং প্রস্তাবিত এআই আইন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আইআইটি আয়োজিত সেমিনার: ‘রেসপন্সিবল এআই ফর বাংলাদেশ’; ইউনেস্কো এআই এথিক্স গাইডলাইনস এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার রিপোর্ট।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *