প্রতিবেদন

আসন্ন নির্বাচনে এআই-এর অপপ্রচার ও ভোটার বিভ্রান্তির শঙ্কা

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা): আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনকে ঘিরে যেমন প্রত্যাশা তুঙ্গে, তেমনি পর্দার আড়ালে ঘনিয়ে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর চ্যালেঞ্জ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একে ‘তথ্যপ্রযুক্তির বন্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে তৈরি নিখুঁত ডিসইনফরমেশন ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এটি কেবল প্রোপাগান্ডা নয়, বরং ‘অ্যালগরিদমিক ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে জনমত পরিবর্তনের এক ডিজিটাল লড়াই। তাই প্রযুক্তির অপব্যবহার রুখে সঠিক রায় নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্র ও নাগরিকের জন্য প্রধান পরীক্ষা।

এআই-এর ‘ডিজিটাল প্লাবন’ ও ভোটার বিভ্রান্তি
এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল অপপ্রচার অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এআই ব্যবহার করে এমন সব কন্টেন্ট তৈরি করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরা প্রায় অসম্ভব। সবচেয়ে ভয়ের কারণ ডিপফেক ভিডিও ও ভয়েস ক্লোনিং। কোনও নেতার কণ্ঠ হুবহু নকল করে তাকে দিয়ে এমন কিছু বলিয়ে দেয়া হতে পারে, যা তিনি বলেননি। গ্রামীণ ভোটারদের প্রভাবিত করতে এখন চাটগাঁইয়া বা সিলেটি আঞ্চলিক উপভাষা নকল করা হচ্ছে।

এ ছাড়া এআই-চালিত রোবো-কলিং-এর মাধ্যমে সরাসরি ফোনে বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা দেয়া, কিংবা এআই বট ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে হাজার হাজার ভুয়া কমেন্ট ও প্রতিক্রিয়া তৈরির মাধ্যমে কৃত্রিম জনমত সাজানো হচ্ছে। প্রযুক্তিগতভাবে ‘মাইক্রো-টার্গেটিং’ ও ‘ডার্ক অ্যাডস’-এর মাধ্যমে ভোটারদের ব্যক্তিগত আচরণ বিশ্লেষণ করে সরাসরি উস্কানিমূলক তথ্য পৌঁছে দেয়া এবং নির্বাচন কমিশনের লোগো ব্যবহার করে নিখুঁত ভুয়া প্রমাণপত্র বা গেজেট তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপের মতো ‘ডার্ক নেটওয়ার্ক’ ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো এবং ফেস-অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য পাচার করে ভোটারদের নিউজফিড নিয়ন্ত্রণ করার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয়ে এবং নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ‘ডিপ ন্যুড’ বা বিকৃত ছবি ছড়ানোর অপচেষ্টা সম্পর্কে।

বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির উপায়: আসল ও এআই শনাক্তকরণ
প্রযুক্তির এই কারসাজি চেনার কিছু সূক্ষ্ম উপায় রয়েছে-
ভিডিওতে অসঙ্গতি: বক্তার চোখের পলক কি স্বাভাবিক? ঘাড়ের নড়াচড়া আড়ষ্ট কি না এবং ঠোঁটের সঙ্গে কথার মিল আছে কি না লক্ষ্য করুন।
ছবির খুঁত: এআই প্রায়ই আঙুলের সংখ্যা বা গঠনে ভুল করে। ছবির পেছনের অংশ বা ছোট লেখা অস্পষ্ট থাকলে তা নিয়ে সন্দেহ করুন।
অডিও শনাক্তকরণ: যান্ত্রিক কণ্ঠ বা স্বাভাবিক আবেগহীন কণ্ঠস্বর ভুয়া অডিও চেনার লক্ষণ।
বিবেচনা প্রসূত প্রশ্ন: কোনও খবর শেয়ার করার আগে এর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মূলধারার সংবাদের সঙ্গে মিল যাচাই করুন। মনে রাখবেন, গুজব অনেক সময় অফলাইনে (শেয়ারইট বা ব্লুটুথ) ছড়ায়।

আইনি সুরক্ষা ও নির্বাচন কমিশনের কঠোর বিধিমালা
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইতিমধ্যে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা ২০২৫’-এ কঠোর সংশোধন এনেছে। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। বিটিআরসি ও আইসিটি বিভাগের সহায়তায় একটি কেন্দ্রীয় ডিসইনফরমেশন মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে যা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত গুজব শনাক্ত করবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রচারণায় এআই ব্যবহার করলে তাতে অবশ্যই ‘এআই জেনারেটেড’ লেবেল থাকতে হবে।

অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা ও সরকারের ভূমিকা
গুজব সৃষ্টিকারীদের দমনে সরকার ও ইসি সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ রহিত করে জারি করা হয়েছে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’। এই অধ্যাদেশের ৩২ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে ৭ থেকে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। মেটা, টিকটক এবং গুগলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরকার যোগাযোগ রাখছে এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য একটি ‘ডিজিটাল এথিক্স গাইডলাইন’ প্রণয়নের কাজ চলছে।

জনসচেতনতা ও উত্তরণের পথ
এই সন্ধিক্ষণে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা করা জরুরি। তথ্য পাচার ও পারসেপশন ম্যানিপুলেশন থেকে বাঁচতে অপরিচিত অ্যাপ বা লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এখানে তরুণ ভোটারদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। পরিবারের বড়রা যখন কোনও খবর দেখে বিভ্রান্ত হন, তখন তরুণদের উচিত তা রিউমার স্ক্যানার বা ফ্যাক্ট ওয়াচ-এর মাধ্যমে যাচাই করে দেয়া। নির্বাচনের দিন ভুয়া ফলাফল বা ‘এক্সিট পোল’ প্রচার রুখতে কেবল মূলধারার গণমাধ্যমের তথ্যে আস্থা রাখতে হবে।

ডিজিটাল সচেতনতাই আমাদের ব্যালটের ঢাল
২০২৬-এর নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ‘ডিজিটাল লিটারেসি’র চূড়ান্ত পরীক্ষা। আমরা এমন যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে ডিপফেক বা ভয়েস ক্লোনিং সত্য-মিথ্যার সীমারেখা মুছে দিচ্ছে। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে প্রয়োজন ‘প্রযুক্তিগত দেশপ্রেম’, যেখানে প্রতিটি নাগরিক মিথ্যার বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরী হবে। একটি কারসাজি করা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে, যা জাতীয় স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাই ‘যাচাই ছাড়া বিশ্বাস নয়’-এই মন্ত্রই হোক আমাদের গণতন্ত্র রক্ষার হাতিয়ার। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নেয়া প্রতিটি স্বাধীন সিদ্ধান্তই গড়ে তুলবে আগামীর সমৃদ্ধ ও স্বচ্ছ বাংলাদেশ।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *